উপসম্পাদকীয়

শ্রমের মজুরি

সাধারণ অর্থে শ্রমের মজুরি বলতে আমরা বুঝি একজন শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে প্রাপ্ত পারিশ্রমিক বা অর্থ। বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এ মজুরির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে- মজুরি অর্থ টাকায় প্রকাশ করা হয় বা যায় এমন সব পারিশ্রমিক যা কোনো শ্রমিককে তার চাকরির জন্য বা কাজের জন্য প্রদেয় হয় এবং নিম্নলিখিত ব্যতীত উক্তরূপ প্রকৃতির অন্য কোনো অতিরিক্ত প্রদেয় পারিশ্রমিকও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। যথা- (ক) বাসস্থান সংস্থান, আলো, পানি, চিকিৎসা সুবিধা বা অন্য কোনো সুবিধা প্রদানের মূল্য অথবা সরকারের সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা বাদ দেয়া হয়েছে এরূপ কোনো সেবার মূল্য, (খ) অবসর ভাতা তহবিল বা ভবিষ্য তহবিলে মালিকের প্রদত্ত কোনো চাঁদা, (গ) কোনো ভ্রমণ ভাতা অথবা কোনো ভ্রমণ রেয়াতের মূল্য এবং (ঘ) কাজের প্রকৃতির কারণে কোনো বিশেষ খরচ বহন করায় কোনো শ্রমিককে প্রদত্ত অর্থ। উপরোল্লিখিত সংজ্ঞার অতিরিক্ত শ্রম আইন-২০০৬-এ মজুরির একটি বিশেষ সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এ বিশেষ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সংজ্ঞায় বর্ণিত পারিশ্রমিক ছাড়াও নি¤œলিখিত পারিশ্রমিকগুলো মজুরির অন্তর্ভুক্ত হবে। যথা- (ক) নিয়োগের শর্ত মোতাবেক প্রদেয় কোনো বোনাস অথবা প্রদেয় অন্য কোনো পারিশ্রমিক (খ) ছুটি, বন্ধ অথবা অধিকাল কর্মে প্রদেয় কোনো পারিশ্রমিক (গ) কোনো আদালতের আদেশ অথবা পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কোনো রোয়েদাদ বা নিষ্পত্তির অধীনে প্রদেয় কোনো পারিশ্রমিক (ঘ) চাকরির অবসান, ছাঁটাই, ডিসচার্জ, অপসারণ, পদত্যাগ, অবসর, বরখাস্তের কারণে এ আইনের অধীনে প্রদেয় কোনো অর্থ এবং (ঙ) লে-অফ অথবা সাময়িক বরখাস্তের কারণে প্রদেয় কোনো অর্থ।

আমাদের দেশে দু’ধরনের শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্রের গঠিত কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে। এ দু’ধরনের শ্রমিক হলো রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান হলো সরকারি পাটকল, সরকারি চিনিকল, সরকারি কাগজকল, রেল শ্রমিক, অভ্যন্তরীণ নৌ-কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি। এখন পর্যন্ত ব্যক্তি মালিকানাধীন ৪২টি শিল্প খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি সরকার নির্ধারণ করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পোশাক শিল্প, পাটকল, চা বাগান, জাহাজ ভাঙা, ট্যানারি, বিড়ি, প্লাস্টিক, কোল্ড স্টোরেজ, ওষুধ, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, হোমিওপ্যাথ কারখানা, পেট্রলপাম্প, জুতা কারখানা, সিনেমা হল, দর্জি কারখানা, আয়ুর্বেদিক কারখানা, হোসিয়ারি, হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, বেকারি বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি, রাইস মিল, কটন টেক্সটাইল, সোপ অ্যান্ড কসমেটিক্স, রি-রোলিং মিলস, প্রিন্টিং প্রেস, গ্লাস অ্যান্ড সিলিকেটস, চিংড়ি, টি-প্যাকেটিং, সড়ক পরিবহন, সল্ট ক্রাশিং, সিকিউরিটি সার্ভিস প্রভৃতি। ব্যক্তিমালিকানাধীন ৪২টি শিল্প খাত এবং সম্প্রতি মজুরি নির্ধারণের নিমিত্ত কার্যক্রম চলমান চারটি সেক্টর যথা- সিরামিকস, সিমেন্ট কারখানা, পোলট্রি ফার্ম ও ব্যাটারি প্রস্তুতকারক ছাড়া এরূপ অনেক শিল্প সেক্টর রয়েছে যেখানে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মরত। কিন্তু এসব শিল্প সেক্টর সরকার কর্তৃক ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প সেক্টর হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় এসব শিল্প খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি প্রদানে অভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হচ্ছে- ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রঙ ও কেমিক্যাল কারখানা, জুয়েলারি, ইলেকট্রনিক্স কারখানা, ইটভাটা, ক্যাবল কারখানা, ব্যাভারেজ কারখানা, সিগারেট, বলপেন, দুগ্ধ খামার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর প্রভৃতি।

দেশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কৃষি, গৃহস্থালি ও রিকশা চালনা কাজে নিয়োজিত। এসব শ্রমিক একজন ব্যক্তিমালিক কর্তৃক সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে তার প্রয়োজনের নিরিখে নিয়োজিত বিধায় এগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্প হিসেবে ঘোষণার অবকাশ সীমিত। তা ছাড়া কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা সাময়িক বা মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। রিকশা চালনার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা পালায় কাজ করে থাকে এবং প্রতিদিন একটি পালায় একজন রিকশাচালক সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা কাজ করে থাকে। রাজধানী ঢাকায় একটি পালা সকাল ৬টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। অপরটি বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। পালার বাইরে যেসব রিকশাচালক রিকশা চালানোর কাজে নিয়োজিত তাদের অনেকে নিজ মালিকানাধীন রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

বর্তমানে শহরাঞ্চলে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে দু’ধরনের ব্যক্তি গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত। একটি সার্বক্ষণিক, যারা গৃহকর্তার বাসায় থেকে যাবতীয় কাজ করেন। অন্যটি খণ্ডকালীন, যারা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় গৃহকর্তার বাসা-বাড়িতে নির্ধারিত কিছু কাজ করেন। যদিও আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উপরোক্ত তিন ধরনের কাজ যথা- কৃষি, গৃহস্থালি ও রিকশা চালনায় নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের সুযোগ সীমিত কিন্তু এসব শ্রমিকের কাজের পরিধি নির্ধারণপূর্বক নি¤œতম মজুরি কাঠামোর আওতাভুক্তের সুযোগ রয়েছে। এটিকে কার্যকর করতে হলে সরকারের সদিচ্ছার আবশ্যকতা রয়েছে।

Show More

Related Articles

Back to top button