উপসম্পাদকীয়

ঈদযাত্রা ঈদ আনন্দ ঐতিহ্য

ঈদ! শব্দটিতে জড়িয়ে আছে এক অপূর্ব আনন্দ শিহরণ। শব্দটি নিমেষেই পরিবেশের আবহ বদলে দেয়। সব অভাব অনটন দুঃখ বেদনা সরিয়ে অদৃশ্য এক আনন্দ অনুভবে মন ভরিয়ে দেয়। মুসলিম জীবনাচারে ঈদ পেছনে ফেলে আসা আত্মীয় পরিজনের সাথে মিলিত হওয়ার আনন্দে উদ্বেল করে তোলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। আত্মীয় পরিজন, শৈশবের বন্ধু, সবার সাথে ঈদ আনন্দকে ভাগ করে নেয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা সবাইকে ঘরমুখী ও শেকড়মুখী করে তোলে। নাড়ির অচ্ছেদ্য টান- যেন প্রাণ ফিরে পায়-ঈদ এলেই। প্রবাসের দুঃখ বেদনা যন্ত্রণা সব পেছনে ফেলে তাই তো মানুষ অনেক কষ্ট করে হলেও ছুটে যায় আপন জনের মাঝে। পথের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট আমলে না নিয়েই সবাই ফিরতে চায় ফেলে আসা শত সহ¯্র স্মৃতিবিজড়িত শৈশবের পরিবেশে, আত্মীয় পরিজন এবং বন্ধুদের মাঝে। এ এক অপার্থিব আনন্দক্ষণ। হাজার বছর ধরে চলে আসা এক ধারাবাহিকতা। মুসলিম জীবনাচারের সাংস্কৃতিক ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ ঈদ এবং ঈদ আনন্দ।

হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ধারাবাহিকতায় এখনো ঈদের ছুটি, ঈদযাত্রার সরলীকরণ করা যায়নি, বিশেষ করে আমাদের দেশে। প্রতি বছরই পুনঃপৌনিকভাবে একটা সমস্যা এই আনন্দকে প্রায়ই বিষাদে পরিণত করে। তা হচ্ছে ঈদের ছুটি বিন্যাস। ঈদুল ফিতরের ক্ষেত্রেই এটি ঘটে থাকে। ২৭ রমজানের পরদিন ২৮ রমজান সরকারি ছুটি। ২৯ রমজান নিয়ে বিভ্রাট কেন যেন সমন্বয় করা যাচ্ছে না। ২৯ রমজান অফিসের কার্যদিবস। এ দিন দাফতরিক কাজ সেরে ৩০ রমজানের হিসাব মেলানো অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে যখন রমজান মাস ২৯ দিনে হয়ে থাকে। মূলত ২৯ রমজান একমাত্র ব্যাংক ও হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও কোনো কাজ হয় বলে মনে হয় না। সকালে অফিসে হাজিরা দিয়েই বেশির ভাগ লোক ছোটে বাস-ট্রেন স্টেশনে বা বিকল্পভাবে গ্রামে ফিরে যাওয়ার তাড়নায়। এরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পরিবার পরিজনের সাথে ঈদ আনন্দে অংশ নেয়ার জন্য ছুটে যান। ফলে সড়কে, লঞ্চে, ট্রেনে-বাসে থাকে অসহনীয় যান ও জনজট। সাথে প্রতিযোগিতা করে বাড়তে থাকে সড়ক দুর্ঘটনা এবং জীবনহানি। ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতদের পরিবারে নেমে আসে আজীবন কান্না। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে অন্ধকার নেমে আসে অনেক পরিবারে। শুধু এ বছরই ঈদযাত্রায় মৃত্যু হয়েছে ৩৬৭ জনের (প্রথম আলো, ২৬ এপ্রিল) যা ২০২৩ সালে ছিল ২৮৫ জন। ঈদযাত্রা নির্বিঘœ এবং উপভোগ্য করতে সংশ্লিষ্ট সবার সব আয়োজনকে ব্যঙ্গ করে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঈদযাত্রায় মৃত্যুহার।

কর্তৃপক্ষ সহজেই এর একটা সুরাহা করতে পারে। তা হচ্ছে দুই ছুটির মাঝখানের এই এক দিন ঈদ ছুটির সাথে মিলিয়ে ঈদের আগের চার দিন এবং ঈদের পরের তিনদিন মোট সাত-আট দিন ছুটি ঘোষণা করলে ঈদযাত্রায় অসহনীয় কষ্ট থেকে শেকড়মুখী লাখো মানুষ রেহাই পেতে পারে। এমনিতেও ঈদের আগে পরে প্রায় সাত-আট দিন অফিসগুলোতে বিশেষ কোনো কাজ হয় না স্বল্প উপস্থিতির কারণে। ঈদের এই বর্ধিত ছুটি বছরের অন্য ছুটির সাথে সমন্বয় করে নেয়া যায়। দ্বিতীয়ত, ৩০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জরুরি কাজের জন্য কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত রাখা, ঈদের নির্দিষ্ট দিনগুলো বাদে। এদের সবাইকে ওভারটাইম দিয়ে পরবর্তী যেকোনো ছুটির সাথে ছুটি যোগ করে দেয়া যেতে পারে। এই নিয়ম চক্রাকারে প্রচলন করলে সড়কে প্রাণান্তকর ভিড়, যানজট বা দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। আরো একটা ব্যাপার খেয়াল রাখলে ঈদযাত্রা নির্বিঘœ হয়ে উঠতে পারে। তা হচ্ছে ঈদের আগের চার-পাঁচ দিন মূল সড়কে ট্রাক চলাচল বন্ধ রাখা। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গাড়িচালকদের ছুটি ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দেয়া। পৃথিবীর বহু দেশেই এটা প্রচলিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

ইদানীং ঈদ উৎসবে আরেকটি উপসর্গ যোগ হয়েছে। ঈদ উদযাপনের জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, বালি, ভারত, নেপাল এমনকি আমেরিকা বা ইউরোপের যেকোনো দেশে যাওয়া। যারা ঈদে এসব দেশে যান তারাই ভালো বলতে পারবেন কেন যান। এর সাথে ঈদের শিক্ষা বা সংস্কৃতির কতটুকু সামঞ্জস্য আছে তা ভেবে দেখার অনুরোধ করি। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। শুধু তাদের যাওয়া আসার বিমানভাড়া দিয়ে নিজ নিজ এলাকায় গড়ে কমপক্ষে ১০০টি পরিবারে ঈদের খুশি ছড়িয়ে দিতে পারেন, যা ঈদের শিক্ষা। অন্যদিকে যারা ঈদের নামে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটান তাদের রোখার দায়িত্ব সরকারের। কষ্টার্জিত এবং সাহায্য হিসেবে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার এহেন অপচয় অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।

আর একটি কথা। ঈদে বিদেশী পণ্য না কিনে দেশীয় পণ্য কেনার অভ্যাস গড়ে তুললে এক দিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়, তেমনি সাথে সাথে দেশীয় উদ্যোক্তাদেরও উৎসাহ দেয়া যায়।

Show More

Related Articles

Back to top button